সাহাবা ও উম্মাহাতুল মুমিনীনদের নিয়ে কটূক্তির বিরুদ্ধে পাকিস্তানে আইন পাস

শিয়া-সহ অন্যান্য দলগুলোর উগ্রতা, ইসলাম বিকৃতি, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবা বিদ্বেষ নির্মূল এবং ধর্মীয় দ্বন্দ্ব নিরসন করে ইসলাম ধর্মের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পাকিস্তানের প্রাদেশিক সংসদ গুলোতে ‘তাহাফফুজে বুনিয়াদে ইসলাম’ নামে (ইসলামের মূলভিত্তি ঠিক রাখা সংক্রান্ত) একটি বিল পাশ করা হয়েছে।

গত বুধবার (২২ জুলাই) বিলটি সর্বপ্রথম পাঞ্জাবের প্রাদেশিক সংসদে উত্থাপিত হয়। এর একদিন পর বৃহস্পতিবার সর্বাধিক সমর্থনের ভিত্তিতে সেখানকার স্পিকার চৌধুরী পারভেজ এলাহী বিলটি অনুমোদন দেন।

পাঞ্জাবের প্রাদেশিক সংসদে বিলটি অনুমোদনের পর পাকিস্তানের অন্যান্য প্রাদেশিক সংসদগুলোতেও এই বিলটিকে অনুমোদন দেওয়া হয়।

সংসদে বিলটি পাশ হওয়ার পর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পাঞ্জাব গভর্নর চৌধুরী মুহাম্মাদ সারওয়ারের কাছে পাঠানো হয়েছিল।

এ বিষয়ে গভর্নরের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, বিলটির ব্যাপারে কয়েকটি পক্ষ তুমুল আপত্তি জানিয়েছে। তাছাড়া এটি খুবই স্পর্শকাতর একটি বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত। তাই আমি এখনই বিলটি অনুমোদন না করে চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণের জন্য স্টাডিজ কমিটির কাছে পাঠিয়েছি।

পাকিস্তানের কয়েকজন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ এই বিল ও পাঞ্জাব গভর্নরের এই সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তবে তাদের মতে, সামনে আরবি মুহাররম মাস (শিয়া ও কাদিয়ানীরা এই মাসে বিভিন্ন উপলক্ষ উদযাপন করে ) আসছে তাই এই বিলটি এখনই চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত করে আইন হিসেবে কার্যকর করা ঠিক হবে না। কেনোনা এতে করে তখন চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। যেহেতু শিয়ারাই কট্টর সাহাবা বিদ্বেষী।

এই বিলটি পাশের সময় কিছুসংখ্যক সাহাবা বিদ্বেষী সাংসদ হুমকি-ধমকি দিয়ে সংসদের অভ্যন্তরেই বাক-বিতণ্ডা শুরু করে দেয়। এমনকি তাদের সামনে থাকা এজেন্ডা ফাইল ছিড়ে ফেলে।

বিলটির বিরোধিতা করে সংসদে এই ধরনের অসভ্যতার প্রদর্শনকারীদের ব্যাপারে সরকার দলীয় সংসদ সদস্য সাঈদ আকবর নওয়ানী বলেন, এই বিলটি ১১ কোটি জনগণের প্রাণের দাবির বাস্তব প্রতিফলন। বিলটি পাশ হওয়ায় এখন সরকারের কাজ হলো তা কার্যকর করা।

পাকিস্তানে শিয়াদের রাজনৈতিক দল মজলিস-এ-ওয়াহাদাত-ই-মুসলামিনের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল রাজা নাসির আব্বাস জাফারি রবিবার (২৬ জুলাই) সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, পাকিস্তান সংবিধানের উপস্থিতিতে অন্য কোনও বিলের দরকার নেই। পাঞ্জাব বিধানসভায় উপস্থাপিত তাহাফফুজে বুনিয়াদে ইসলাম বিলটি অন্যের উপর নিজের মতামতকে চাপিয়ে দেওয়ার প্রয়াস বলেও তিনি দাবি করেন। তার মতে এই বিল পাকিস্তানের সংবিধান এবং মৌলিক মানবাধিকারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আমরা শিয়া সম্প্রদায় এই বিলটিকে প্রত্যাখ্যান করছি।

এদিকে কেন্দ্রীয় জমিয়তে আহলে হাদীস পাকিস্তানের প্রধান সিনেটর অধ্যাপক সাজিদ মীর পাঞ্জাবের প্রাদেশিক সংসদে ইসলামের সুরক্ষা সংক্রান্ত বিলটি পাসের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ইসলামের মূল চেতনার স্তর নিবিষ্ট করণ ও শাখা-উপ-শাখাগত সাম্প্রদায়িকতা নির্মূলে এই আইনটি সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। অল্পকিছু সংখ্যক লোক যারা এই আইনের বিরোধিতা করে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে, তারা মূলত দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায়।

সাহাবা বিদ্বেষ বন্ধের জন্য পাশ করা এই বিলটির সমর্থনে তিনি জোড়ালোভাবে বলেন, রাজনৈতিক বিরোধ থাকতেই পারে তবে এতে কারো বিরোধিতা করা উচিত নয়। কেনোনা ইসলাম রাজনীতি থেকে অগ্রগণ্য।

এসময় তিনি ঐক্যের আহবান জানিয়ে বলেন, আফসোস! সেকুলার ও লিবারেল পন্থী দলগুলো সাহাবায়ে কেরাম, খুলাফায়ে রাশেদীন ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আঝওয়াজে মুতাহহারাত (পবিত্র স্ত্রীদের) ব্যাপারে শত্রুতা পোষণে একজোট হয়ে গিয়েছে। মুসলমানদেরও উচিত নিজেদের কাতার সোজা করে একজোট হওয়া।

অপরদিকে কেন্দ্রীয় জমিয়তে আহলে হাদীস পাকিস্তানের নাজিম-ই-আলা (হাই কমিশনার) সিনেটর ডা: হাফিজ আবদুল করিম এই বিলটি সমর্থন করে বলেছেন, পাঞ্জাব বিধানসভা কর্তৃক ইসলামের সুরক্ষা আইনের অনুমোদন একটি প্রশংসনীয় পদক্ষেপ।

তাছাড়া রবিবার (২৬ জুলাই) স্পিকার চৌধুরী পারভেজ এলাহী আলেম-ওলামাদের সাথে ফোনালাপকালে বলেন, আমি আর আমার বংশধরেরা থাকা অবস্থায় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম ও আহলে বাইতের শানে বেয়াদবী করতে দেওয়া হবে না।

উল্লেখ্য, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহী ওয়া-সাল্লামের নবুওয়াত অস্বীকারকারী কাদিয়ানীরা ছাড়াও প্রতি বছর আরবি মুহাররম মাসে পাকিস্তানের শিয়া সম্প্রদায় বিভিন্ন উপলক্ষকে কেন্দ্র করে শোক পালনসহ নানাভাবে মাসটিকে উদযাপন করে থাকে। এমনকি তারা বিভিন্ন বই-পুস্তক, লিফলেট, সভা-সমাবেশেরও আয়োজন করে থাকে। এসব বই-পুস্তক, লিফলেট ও সভা-সমাবেশে তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম, পবিত্র আহলে বাইত ও উম্মাহাতুল মুমীনীনদের কটাক্ষ করাসহ ইসলাম বিকৃত ঘটনাবলী প্রচার করে থাকে।

তাহাফফুজে বুনিয়াদে ইসলাম বিলটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয়ে আইন হিসেবে কার্যকর হলে যেখানেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম উল্লেখিত হবে, সেখানেই নামের পর খতামুন নাবিয়্যিন (শেষ নবী) লিখা আবশ্যক হবে এবং রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আহলে বাইত, খুলাফায়ে রাশেদীন, সাহাবায়ে কেরাম ও উম্মাহাতুল মুমিনীনদের শানে বেয়াদবীমূলক কথাবার্তা বা কটু শব্দের ব্যবহার গ্রেফতারযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হবে।

সূত্র: ডেইলি নিউজ পাকিস্তান, জিও নিউজ, ডেইলি জঙ্গ

Sharing is caring!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *