সবুজ কলাপাতার নিচে মাটির ঘরে হবিগঞ্জের সেই আদরের সোনা ‘সোহা’

অভাব-অনটনের সংসার, আছে ঋণের চাপও। তবু দুই ছে’লে-মে’য়েকে নিয়ে সুখেই ছিলেন মহিন আহমেদ সোহেল ও নাজমা আক্তার দম্পতি। দুই ছে’লে মে’য়েকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। তাইতো তাদের সুখের কথা চিন্তা করে গ্রামের বাড়ি বানিয়াচং ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন চট্টগ্রামে।

সংসারে যথই অভাব-অনটন থাক-না কেন, কখনো ছে’লে-মে’য়েদের ইচ্ছা অ’পূর্ণ রাখেননি। কিন্তু কে জানত এত আদরের মে’য়েকে এভাবে হারাতে হবে, ভেঙে ছুরমা’র হয়ে যাবে সাজানো সংসার।

মঙলবার রাত ৩টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় ভ’য়াবহ ট্রেন দুর্ঘ’টনা কেড়ে নেয় মহিন আহমেদ সোহেল ও নাজমা আক্তার দম্পতির দুই বছর দুই মাস বয়সী একমাত্র মে’য়ে আদিবা আক্তার সোহাকে। এ ঘটনায় আ’হত হয়ে ঢাকা পঙ্গু হাসপাতা’লে ভর্তি রয়েছেন সোহেল ও নাজমা।

পরিবারের লোজনের সাথে কথা বলে জানা যায়- অভাবের তারনায় ছে’লে-মে’য়েকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি হবিগঞ্জের বানিয়াচং ছেড়ে চট্টগ্রামে গার্মেন্টে চাকরি করতেন সোহেল ও নাজমা। সেখানে একটি ভাড়া বাসায় পরিবারের সবাইকে নিয়ে বসবাস করতে। সঙ্গে থাকতেন নাজমা’র মা রেনু আক্তার (৪৫)। তাদের অনুপস্থিতিতে দুই সন্তানকে দেখাশোনা করতেন তিনি।

দূর্ঘটনার রাতে দেশের বাড়ি বানিয়াচং থেকে কর্মস্থল চট্টগ্রাম ফেরার পথে দুই ছে’লে-মে’য়ে, স্ত্রী’ ও শ্বাশুড়ি রেনু আক্তারকে নিয়ে রাত সাড়ে ১২টায় শায়েস্তাগঞ্জ থেকে ‘উদয়ন এক্সপ্রেস’ ট্রেনে ওঠেন সোহেল। রাত ৩টার দিকে ভ’য়াবহ ট্রেন দূর্ঘটনায় নি’হত হয় তাদের একমাত্র আদরের মে’য়ে সোহা। এ ঘটনায় আ’হত হন সোহেল ও নাজমা। তবে তাদের ছে’লে ও শ্বাশুড়ির থেমন কোন ক্ষতি হয়নি।

সকালে সোহামণির মৃ’ত্যুর খবর আসে বাড়িতে। সঙ্গে সঙ্গে শোকে স্তব্ধ হয়ে যায় চারপাশ। বাড়িতে কা’ন্নার রোল পড়ে। এরই মধ্যে গুরুত্বর আ’হত সুহেল ও নাজমাকে ঢাকা পঙ্গু হাসপাতা’লে প্রেরণ করা হয়। সারাদিন সোহার ম’রদেহ পড়ে থাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতা’লে ফ্লোরে। এমন একটি ছবিও নিমেষেই ভাই’রাল হয়ে যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। যে ছবিটি নাড়া দেয় দেশবাসীর হৃদয়কে। পরে ওই দিন বিকেলে বাড়ি থেকে লোকজন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতা’লে সকল প্রকৃয়া সম্পন্ন করে সোহার ম’রদেহ বাড়িতে এনে দাফন করা হয়। নিয়তির নি’র্মম পরিহাস, এত আদরের মে’য়েকে শেষবারের মতো দেখা হলো না মা-বাবার। তাদের অনুপস্থিতিতেই মাটি চাপা দেয়া হলো সোনার প্রতীমাকে।

বুধবার (১৩ নভেম্বর) বিকেলে বানিয়াচং উপজে’লার তাম্মলিটুলা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়- শোকে স্তব্ধ চারপাশ। শুনসান নিরবতা বিরাজ করছে সোহার বাড়িতে। বাড়িতে ছিলেন সোহার দাদী সামছুন্নাহার বেগম, ফুফু জাহানারা বেগমসহ কয়েকজন আত্মিয়। সোহার বিষয়ে তাদের কাছে জানতে চাইলেই হাওমা’ও করে কেঁদে উঠেন তাঁরা। তাদের কা’ন্নায় চোখে পানি ধরে রাখতে পারেননি সেখানে উপস্থিত কেউই। এক হৃদয় বিধারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয় সেখানে।

বুক ভরা আর্তনাদ নিয়ে শি’শু সোহার দাদী সামছুন্নাহার বেগম বলেন- ‘আমা’র নাতনি যখনই বাড়িতে আসত তখনই আমা’র কত ভালো রাগত। সারাক্ষণ আমা’র সাথে থাকত। মিষ্টি মিষ্টি কথা বলত। খাবার খাওয়ার পর আমাকে পানের ভাড়া এনে দিয়ে বলত ‘দাদী আমি তুমাকে পান বানিয়ে দেই?’

তিনি বলেন- ‘আজ আমা’র নাতনি এই পৃথিবীতে নেই ভাবতেই পারছি না। এই বলেই তিনি কা’ন্নায় ভেঙে পড়েন।’

সোহার ফুফু জাহানারা বেগম বলেন- ‘সোহামণি অনেক মিষ্টি মে’য়ে ছিল। মিষ্টি মিষ্টি কথা বলত বলে আম’রা ইচ্ছে করেই থাকে শুধু শুধু কথা বলাতাম। কিন্তু এখন আর আমাদের সোহামণি কোন কথা বলবে না।’

তিনি বলেন- ‘আমি আমা’র সোহামণির মৃ’ত্যুর বিচার চাই। এছাড়া সোহামণির বাবা-মা খুব দরিদ্র। তারা ঢাকা পঙ্গু হাসপাতা’লে ভর্তি রয়েছে। ভালো চিকিৎসা করার সাম’র্থ তাদের নেই। তাই আমি সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি তাদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেয়ার জন্য।’

প্রতিবেশি সেলিম আহমেদ বলেন- ‘মে’য়েটি অনেক মিষ্টি ছিল। আমাদের সাথে অনেক মিষ্টি মিষ্টি কথা বলত। কিন্তু আজ এই মে’য়েটি দুনিয়াতে নেই। এছাড়া মে’য়েটির মা-বাবাও পঙ্গু হাসপাতা’লে ভর্তি আছেন। তারা খুব দরিদ্র, তাই সরকারের কাছে তাদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা ও কিছু আর্থিক সহযোগিতার দাবি জানাই।’

ইম’দাদুল হোসেন খান বলেন- ‘এত ছোট নিষ্পাপ মে’য়েটি এভাবে দুনিয়া থেকে বিদায় নেবে তা মেনে নিতে আমাদের খুব ক’ষ্ট হচ্ছে। এর উপর আবার তার মা-বাবাও পঙ্গু হাসপাতা’লে ভর্তি রয়েছে। তাদের উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন।’

তিনি বলেন- ‘পরিবারটি খুব দরিদ্র, তাদের পক্ষে ভালো চিকিৎসা করানো সম্ভব না। তাই আমি সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি তাদেরকে যেন উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। এবং ভালো একটি অনুদান দেয়া হয়। কারণ সারা জীবন তারা আর কাজ করতে পারবেন কি-না তার ঠিক নেই।’

স্থানীয় ইউপি সদস্য আবদুল সাহেব বলেন- ‘আম’রা পরিবারটিকে সহযোগিতা করার চেষ্ট করছি। এছাড়া সরকারও যদি তাদের একটু বেশি করে সহযোগিতা করে তাহলে ভালো হয়।’

এ ব্যাপারে বানিয়াচং উপজে’লা নির্বাহি কর্মক’র্তা (ইউএনও) মামুন খন্দকার বলেন- ‘ট্রেন দূর্ঘটনায় বানিয়াচংয়ের দুইজন নি’হত হয়েছেন। এছাড়া আ’হত হয়েছেন আরও ১২জন। জে’লা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নি’হত দুই পরিবারকে ১৫ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে। এছাড়াও আম’রা আরও সহযোগিতা করার চেষ্টা করছি। এ ব্যাপারে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আম’রা লিখিত আবেদন জানিয়েছি।’

এদিকে, বাড়ি থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার দূরের একটি করবস্থানে চির নিন্দ্রায় শায়িত করা হয়েছে সোহাকে। সেখানে গিয়ে দেখা যায় মা-বাবার আদরের প্রতীমাটি মাটি চাপা দিয়ে উপরকে সবুজ কলাপাতা দিয়ে কবরটি ডেকে রাখা হয়েছে। এ সময় সেখানে উপস্থিত অনেকেই দীর্ঘ নিঃস্বা ফেলে বলছিল- ‘যে মে’য়েটিকে এতো ভালোবাসত, সেই মে’য়েটিকে শেষ দেখা দেখারও ভাগ্য হলো না তাদের।’

Sharing is caring!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *