স’ন্তানের লা’শ দেখতেও এলেন না বাবা-মা!

কুমিল্লা নগরীর রেইসকোর্স এলাকার ও’ষুধ কোম্পানীর এক কর্মকর্তার বিনা চিকিৎসায় মৃ’ত্যু হয়েছে। এমনকি শেষ বিদা’য়ের দাফনের সময়ও পায়নি স্বজনদের সম্মান। নি’হতের স্ত্রী লা’শ নিয়ে গ্রামের বাড়িতে গেলে সেখানে তাকে বসতে দেয়নি তার বাবা-মা। জানাযা দাফনে আসেনি ভাইয়েরা।

মোবাইল ফোনের আলোয় লা’শ দাফন করেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। কুমিল্লার দেবিদ্বারে এই ঘটনা ঘটে। মৃ’ত অহিদুর রহমান (৩৮) দেবিদ্বার কুরুইন গ্রামের আবদুল মান্নানের ছেলে। দাফনের পর এ নিয়ে বুধবার পরিবার ও স্বজনদের অমানবিকতা নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন উত্তর জে’লা ছাত্রলীগের সভাপতি আবু কাউসার অনিক। তা নিয়ে জে’লায় আলোচনার সৃষ্টি হয়।

ছয়-সাত দিন থেকে জ্বর। আইইডিসিআর-এর নম্বরে যোগাযোগ করেন নমুনা নিতে। কিন্তু তারা ফোন ধরে না। ধরলেও বলে কুমিল্লায় যোগাযোগ করতে। সিটি করপোরেশনে যোগাযোগ করতে। সেখানে ফোন দিলে জানায়, যারা পরীক্ষা করতো তাদের একজনও আ’ক্রান্ত।

কুমিল্লা জেনারেল হাসপাতালে গিয়েও ব্যর্থ হয়। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গেলে জানায় নমুনার জন্য ভর্তি হতে হবে। এভাবে ঘুরাঘুরি করতে করতে সোমবার রাতে তার অবস্থা খা’রাপ হয়ে যায়। মঙ্গলবার সকালে ৯৯৯ নম্বরে কল দেন অ্যাম্বুলেন্সের জন্য।

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে ছয় তলায় বেডে শোয়ানোর পর তিনি মা’রা যান। মা’রা যাওয়ার পর একজন নার্স আসেন। পরে ক্যানোলা দিয়ে ই’নজেকশন দেন, কিন্তু তা আর শরীরের ভেতরে যায় না। এরপর ওই অ্যাম্বুলেন্সেই মৃ’তের বাবার বাড়ি দেবিদ্বারে যান।

সেখানে সন্ধ্যায় পৌঁছানোর পর ওই বাড়ির লোকজন বলে অ্যাম্বুলেন্সের দরজা না খুলতে। তিনি স্বামীর লা’শ নিয়ে একা অ্যাম্বুলেন্সে বসে থাকেন। অন্যদিকে ভাবতে থাকেন তার বাসায় ছয় ও চার বছরের দুই ছেলে ও এক বছরের মেয়ে রয়েছে। অ্যাম্বুলেন্স থেকে নেমে এলেও বসতে কেউ একজন চেয়ার চাইতে গেলে তাও দেওয়া হয়নি। ওই বাড়ির এক ব্যক্তি লা’শ এখানে দাফন না করার জন্য বলেন। স’ন্তানের লা’শ দেখতে তার মা-বাবা কেউ আসেননি। জানাযায় কোনও ভাই আসেননি।

আড়াই ঘণ্টা পর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এসে দাফনের ব্যবস্থা করেন। তিনি ওই অ্যাম্বুলেন্সে ফিরে আসেন। অ্যাম্বুলেন্স চালক দাবি করেন ১৫ হাজার টাকা। অনুনয় করে তাকে ১২ হাজার টাকা দেওয়া হয়।

উত্তর জে’লা ছাত্রলীগের সভাপতি আবু কাউসার অনিক বলেন, অহিদুর রহমানের লা’শটি কবরে নামাতে আমাদের একটি কাপড়ের দরকার পড়ল। তার পরিবারের কাছে চাইলাম, কেউই দিতে এগিয়ে এল না। এক মহিলার একটি পুরনো ওড়না দিলেন। রাত তখন ৯টা পেরিয়ে। অহিদের মৃ’ত্যুর সংবাদ শুনে আমরা কুমিল্লা উত্তর জে’লা ছাত্রলীগ ওরা ৪১ জনের টিম লা’শ দাফনের জন্য তার বাড়িতে গেলাম। অহিদের বাড়ি গিয়ে যা দেখলাম, মৃ’ত্যুর আগ পর্যন্ত আমরা ভু’লতে পারব না!

অহিদের বাড়ির সামনে একটি অ্যাম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে আছে। আশেপাশে খোঁজ করে কাউকে পেলাম না। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম, লা’শ কোথায়? ড্রাইভার ইশারায় দেখিয়ে দিলেন। অ্যাম্বুলেন্সে পলিথিন মোড়ানো কাগজে পড়ে আছে। আমরা অ্যাম্বুলেন্স থেকে লা’শ ধরাধরি করে নামালাম।

তিনি বলেন, লা’শের মালিক খুঁজতে গিয়ে কিছু দূর দেখলাম অন্ধকারে এক মহিলা বসে কাঁদছেন। জানতে পারলাম তিনি মৃ’ত অহিদের স্ত্রী। স্বামী ক’রোনা উপসর্গ নিয়ে মা’রা যাওয়ায় তাকে ঘরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। অহিদের ভাইদের খোঁজ নিয়ে জানলাম ওরা অদৃশ্য।

মা, বোনদের কোনও আলামত পেলাম না। কেউ লা’শের পাশে আসছেন না। প্রতিবেশী সবার দরজা বন্ধ। ইউপি মেম্বার, চেয়ারম্যানকে খোঁজ করেও পাওয়া গেল না। স্থানীয় একজন প্রভাবশালী নেতা এসে বললেন, গ্রামের নির্দিষ্ট কবরে অহিদকে দাফন করা যাবে না। লা’শ নিয়ে যাওয়া যাবে না তাদের স্বাভাবিক চলাচলের পথ দিয়ে। অহিদের বাবার খোঁজ করলাম। তিনি বাড়িতে আছেন কিন্তু নিরাপদে বাসায়! শুনেছিলাম, ‘পিতার কাঁদে নাকি স’ন্তানের লা’শ পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী!’ সে ভার অহিদের বাবা কেন নিতে চাইলেন না, জানি না! ভাবলে চোখে পানি চলে আসে।

তিনি আরও, বলেন, আমরা অহিদের গোসল দিলাম। জানাজা পড়ালাম। নেতার হু’মকির কারণে অহিদের লা’শ নিয়ে চললাম কৃষি জমি হয়ে কখনও কাঁদা পানি, কখনও প্রায় হাটু পানির পথে, পুকুর পাড় বেয়ে, কখনও বাঁশমুড়ার সরু পথ মাড়িয়ে। অহিদের নিথর দেহ নিয়ে চলছি আমরা! ছাত্রলীগের ভাইয়েরা কেউ জিকির করছে, কেউ আমার মতো স্তব্ধ। অহিদের লা’শের পালকি আমাদের কাঁধে। ঠোঁট ফেঁটে চি’ৎকার বের হচ্ছে না!

দু’চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। মনে মনে বলছি, অহিদ আমাদের ক্ষমা করিস ভাই! তার দাফন করেছি মোবাইল ফোনের টর্চের আলোয়। তিনি বলেন,এই পর্যন্ত সাতজনের লা’শ দাফন করেছি। স্বজনরা আসুক না আসুক আল্লাহ সুস্থ রাখলে আমাদের এই যু’দ্ধ চলবে। নগরীর রেইসকোর্স এলাকার কাউন্সিলর স’রকার মাহমুদ জাবেদ বলেন, তার স্ত্রী আমাকে ফোন করেছিলেন। আগে ফোন করলে তার নমুনা পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে পারতাম। তার স্ত্রী-স’ন্তানদের নমুনা সংগ্রহ করা হবে। যদি ক’রোনা পজেটিভ হলে তাদের চিকিৎসা সেবায় কোন গাফলতি হবে না। অবশ্যই সুচিকিৎসা পাবেন।

Sharing is caring!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *