রাজধানীতে স’ক্রিয় ৩৪ কি’শোর গ্যাং, ১৫ বছরে ৮৫ জন খু’ন’

পরনে টি-শার্ট, জিন্স প্যান্ট। চোখে সানগ্লাস। চুলে নতুন স্টাইল। পাড়া, মহল্লা, অলিগলি ও ফুটপাতে জমিয়ে আড্ডা দেয় তারা। প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে দামি লাইটার দিয়ে হিরোদের মতো সিগারেটে দেয় টান। উচ্চস্বরে গান করে। হিন্দি, ইংরেজি গান। মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার ক্ষেত্রে কোনো বয়স বিবেচনা নেই।

ইভটিজিং থেকে শুরু করে তির্যক বাক্য ছুড়ে দেয়। রাত বাড়লেই অভিজাত এলাকায় শুরু হয় ডিসকো পোলার মোটর ও কার রেসিং। এলাকাভেদে এদের রয়েছে পৃথক গ্রুপ। একেকটি গ্রুপকে ‘গ্যাং’ বলা হয়। রাজধানীসহ সারা দেশে ফের ভ’য়ংকর হয়ে উঠছে কিশোরদের ‘গ্যাং’ কালচার’।

এরা কিশোর বলে দণ্ডবিধিতে পু’লিশ এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না। ১৮ বছর পর্যন্ত বয়সের কেউ অ’পরা’ধ করলে তাকে দণ্ডবিধিতে কোনো বিচারকার্য সম্পাদন করা যাবে না। তাদেরকে আ’টক করে শিশু-কিশোর সংশোধনাগারে পাঠাতে হবে। অথচ ঢাকার শি’শু আদালতের বিচারিক কার্যক্রমের নথি অনুযায়ী গত ১৫ বছরে রাজধানীতে কিশোর গ্যাং’ কালচার ও সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বে ৮৬টি খুনের ঘটনা ঘটেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক বলেন, সমাজে নানা অসঙ্গতি রয়েছে। নিজেদের সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে কিশোররা। তাদের আচরণে পরিবর্তন হচ্ছে। কিশোরদের বয়সে হিরোইজম ভাব থাকে। এই হিরোইজমকে সঠিক পথের অনুসারী করে তুলতে হবে। আবার কিশোরদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার কারণে তাদের মধ্যে এক ধরনের গ্যাং কালচার গড়ে উঠছে। এর দায় আমাদের সবার। অনেক ক্ষেত্রে ভিনদেশী সংস্কৃতি ইচ্ছামতো তাদের আয়ত্তে চলে যাওয়ায় তাদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সমাজের শিক্ষক, অভিভাবক, জনপ্রতিনিধি বা যাদের কথা শুনবে—এমন ব্যক্তিদের নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগে এই কিশোর গ্যাং কালচার থেকে বিপথগামী কিশোরদের সুপথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

গোয়েন্দা তথ্য মতে বর্তমানে সারাদেশের ৬৪ জেলায় গ্যাং কালচারের অস্তিত্ব পেয়েছে গোয়েন্দারা। শুধু রাজধানীতেই ৩৪টি গ্রুপ পেয়েছে। এসব গ্রুপের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে। প্রতিদিনই পুলিশের বিশেষ শাখাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দপ্তরগুলোতে কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধের বিষয়ে অভিযোগ আসছে। যার মধ্যে অধিকাংশ কিশোরের বয়স ১৫ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে।

গত তিন বছরে (গত বছর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) শুধু র্যা ব সদস্যরাই প্রায় ৪০০ গ্যাং কালচারের কিশোরকে গ্রেফ’তার করেছে। তবে আইনি জটিলতার কারণে অভিযান অনেকটা থমকে গেলেও ফের অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়। গোয়েন্দা তথ্য মতে প্রতিটি গ্রুপেই রয়েছে কমপক্ষে ১৫ জন করে সদস্য। ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরে আদনান কবির হত্যার পর ‘গ্যাং কালচারের’ বিষয়টি নজরে আসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। এরপর থেকেই অভিযান শুরু করে র্যাব। র্যাবের অভিযানে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন গ্রুপের প্রায় ৪০০ কিশোরকে গ্রেফতার করে র্যাব।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, তারা রাজধানীতে প্রায় ৬০টি কিশোর গ্যাংয়ের সন্ধান পেয়েছে। এর মধ্যে ৩৪ গ্রুপই সক্রিয়। এই ৩৪টি গ্রুপের সদস্যরা দিনদিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

ধানমন্ডিতেই রয়েছে অন্তত তিনটি গ্রুপ—‘নাইন এম এম’, ‘একে ৪৭’ ও ‘ফাইভ স্টার’ গ্রুপ। রায়েরবাজার এলাকায় সক্রিয় ‘স্টার বন্ড গ্রুপ’ ও ‘মোল্লা রাব্বি গ্রুপ’, মোহাম্মদপুরে ‘গ্রুপ টোয়েন্টিফাইভ’, ‘লাড়া দে’, ‘লেভেল হাই’, ‘দেখে ল-চিনে ল’, ‘কোপাইয়া দে গ্রুপ’। তেজগাঁওয়ে ‘মাঈনুদ্দিন গ্রুপ’, মিরপুর-১১তে ‘বিহারি রাসেল গ্যাং’, মিরপুর ১২ নম্বরে ‘বিচ্চু বাহিনী’, ‘পিচ্চি বাবু’ ও ‘সাইফুলের গ্যাং’, সি-ব্লকে ‘সাব্বির গ্যাং’, ডি-ব্লকে ‘বাবু-রাজন গ্যাং’, চ-ব্লকে ‘রিপন গ্যাং’, ধ-ব্লকে ‘মোবারক গ্যাং’।

কাফরুলের ইব্রাহিমপুরে ‘নয়ন গ্যাং’, তুরাগে ‘তালাচাবি গ্যাং’, উত্তরায় ‘পাওয়ার বয়েজ’, ‘ডিসকো বয়েজ’, ‘বিগ বস’, ‘নাইন স্টার’ ও ‘নাইন এম এম বয়েজ’, ‘এনএনএস’, ‘এফএইচবি’, ‘জিইউ’, ‘ক্যাকরা’, ‘ডিএইচবি’, ‘ব্লাক রোজ’, ‘রনো’, ‘কেনাইন’, ‘ফিফটিন গ্যাং’, ‘ডিসকো বয়েস’, ‘পোঁটলা বাবু’, ‘সুজন ফাইটার’, ‘আলতাফ জিরো’, ‘ক্যাসল বয়েজ’, ‘ভাইপার’, ‘তুফান’, ‘থ্রি গোল গ্যাং’ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া দক্ষিণখানে ‘শাহীন-রিপন গ্যাং’, উত্তরখানের বড়বাগের ‘নাজিমউদ্দিন গ্যাং’, আটিপাড়ার ‘শান্ত গ্যাং’, ‘মেহেদী গ্যাং’, খ্রিষ্টানপাড়ার ‘সোলেমান গ্যাং’, ট্রান্সমিটার মোড়ের ‘রাসেল ও উজ্জ্বল গ্যাং’।

হাজারীবাগে ‘বাংলা’ ও গেন্ডারিয়ায় ‘লাভলেট’, বংশালে ‘জুম্মন গ্যাং’, মুগদায় ‘চান-জাদু’, ‘ডেভিল কিং ফুল পার্টি’, ‘ভলিয়ম টু’ ও ‘ভান্ডারি গ্যাং’, চকবাজারে ‘টিকটক গ্যাং’, ‘পোঁটলা সিফাত গ্যাং’ উল্লেখযোগ্য।

র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার প্রধান লে. কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম জানান, কি’শোর অ’পরা’ধী’রা খু’ন, ছি’ন’তাই, চাঁ’দাবা’জি, মা’দক’সে’বন ও বি’ক্রি, নিজেদের মধ্যে মা’রা’মা’রি, মে’য়ে’দের উ’ত্ত্যক্ত’ক’রণ, অ’প’হ’রণ, ধ’র্ষণ’স’হ সাত-আট ধরনের অ’পরা’ধে জ’ড়ি’য়ে পড়ছে। এদের সঠিক পথে আনতে হবে। কি’শো’র অ’পরা’ধী’দের তালিকা নিয়ে ফে’র অ’ভিযা’নে নামবে র্যাব। গ্যাং’ কাল’চা’রের মতো অ’পসং’স্কৃ’তির বি’রুদ্ধে পরিবারের বাবা-মা সহ স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের প্রধান ভূমিকা রাখতে হবে। আমরা অধিকাংশ কিশোর গ্যাং’ সদস্যদের দেখেছি তারা ব্রো’কেন’ ফ্যামিলির সন্তান, আবার কখনো বা নিজের সন্তানদের ঠিকমতো সময় দেন না মা-বাবা। স’র্বোপ’রি একজন কিশোরকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে পরিবারের ভূমিকা অ’নস্বী’কার্য।

ইত্তেফাক

Sharing is caring!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *