ম’সজিদের জায়গায় মন্দির কোন যুক্তিতে: ভারতের সাবেক বিচারপতি

কয়েক দশকের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বাবরি ম’সজিদ-রাম জন্মভূমি নিয়ে করা ঐতিহাসিক অযোধ্যা মা’মলার রায় শনিবার ঘোষণা করেছেন ভারতের সুপ্রিমকোর্ট।রায়ে অযোধ্যার বিরোধীপূর্ণ বাবরি ম’সজিদের জমি মন্দির নির্মাণে হিন্দুদের দিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।আর নতুন একটি ম’সজিদ নির্মাণে মু’সলমান সম্প্রদায়কে শহরেই আলাদা একখণ্ড পাঁচ একরের জমি বরাদ্দ দিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।সুপ্রিম কোর্টের এ রায় নিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকায় মন্তব্য কলাম লিখেছেন দেশটির সাবেক বিচারপতি অশোককুমা’র গঙ্গোপাধ্যায়।

তিনি বলেছেন, ‘এই রায়টা কিসের ভিত্তিতে দেয়া হল, সবটা ঠিক বুঝতে পারছি না। সুপ্রিম কোর্ট দেশের সর্বোচ্চ আ’দালত। সেই আ’দালত একটা রায় দিলে তাকে মেনে নেয়া ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর আমি খুঁজে পাচ্ছি না।চারশো-পাঁচশো বছর ধরে একটা ম’সজিদ একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল। সেই ম’সজিদকে আজ থেকে ২৭ বছর আগে ভেঙে দেয়া হল বর্বরদের মতো আক্রমণ চালিয়ে।

আর আজ দেশের সর্বোচ্চ আ’দালত বলল, ওখানে এ বার মন্দির হবে।সাংবিধানিক নৈতিকতা বলে তো একটা বিষয় রয়েছে! এমন কোনও কাজ করা উচিত নয়, যাতে দেশের সংবিধানের উপর থেকে কারও ভরসা উঠে যায়। আজ অযোধ্যার ক্ষেত্রে যে রায় হল, সেই রায়কে হাতিয়ার করে ভবিষ্যতে এই রকম কা’ণ্ড আরও ঘটানো হবে না, সে নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবেন?

শুধু অযোধ্যায় নয়, মথুরা এবং কাশীতেও একই ঘটনা ঘটবে— এ কথা আগেই বলা হত। যাঁরা গুন্ডামি করে বাবরি ম’সজিদ ভেঙেছিলেন, তাঁরাই বলতেন। এখন আবার সেই কথা বলা শুরু হচ্ছে।যদি সত্যিই মথুরা বা কাশীতে কোনও অঘটন ঘটানো হয় এবং তার পরে মা’মলা-মোকদ্দমা শুরু হয়, তা হলে কী’ হবে? সেখানেও তো এই রায়কেই তুলে ধরে দাবি করা হবে যে, মন্দিরের পক্ষেই রায় দিতে হবে বা বিশ্বা’সের পক্ষেই রায় দিতে হবে অযোধ্যা মা’মলা এর আগেও সুপ্রিম কোর্টে উঠেছে। তখনই আ’দালত স্বীকার করে নিয়েছিল যে, বিতর্কিত জমিতে ম’সজিদ ছিল। যেখানে বছরের পর বছর ধরে নামাজ পড়া হচ্ছে, সেই স্থানকে ম’সজিদ হিসেবে মান্যতা দেওয়া উচিত, এ কথা আ’দালত মেনে নিয়েছিল।

তা হলে আজ এই নির্দেশ এল কী’ ভাবে? যেখানে একটা ম’সজিদ ছিল বলে সুপ্রিম কোর্ট নিজেই মেনেছে, সেখানে আজ মন্দির বানানোর নির্দেশ সেই সুপ্রিম কোর্টই দিচ্ছে কোন যুক্তিতে?ভারতীয় পুরাতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ (এএসআই) জানিয়েছিল, ওই ম’সজিদের তলায় একটি প্রাচীনতর কাঠামোর সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু সেই প্রাচীনতর কাঠামো যে মন্দিরই ছিল, এমন কোনও প্রমাণ তো মেলেনি। সুপ্রিম কোর্ট নিজেও মেনে নিয়েছে যে, পুরাতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণের রিপোর্টে কোনও ভাবেই প্রমাণ হচ্ছে না যে, একটা মন্দিরকে ভেঙে ওখানে ম’সজিদ তৈরি করা হয়েছিল।তা হলে কিসের ভিত্তিতে আজ মন্দির তৈরির নির্দেশ? বিশ্বা’সের ভিত্তিতে। দেশের সর্বোচ্চ আ’দালত বলল, অনেক হিন্দুর বিশ্বা’স যে, ওখানে রামের জন্ম হয়েছিল।

বিশ্বা’স বা আস্থার ম’র্যাদা রাখতে ওই বিতর্কিত জমি রামলালা বিরাজমানের নামে দিয়ে দেওয়া হল। এটা কি আদৌ যুক্তিযুক্ত হল? রামচন্দ্র আদৌ ছিলেন কি না, কোথায় জন্মেছিলেন, সে সবের কোনও প্রামাণ্য নথি কি রয়েছে? নেই।রাম শুধু মহাকাব্যে রয়েছেন। সেই সূত্রে অনেক মানুষের মনে একটা বিশ্বা’সও রয়েছে। কিন্তু সেই বিশ্বা’সের বলে একটা ম’সজিদের জমি মন্দিরের নামে হয়ে যেতে পারে না।কালকে যদি আমি বলি, আপনার বাড়ির নীচে আমা’র একটা বাড়ি রয়েছে, এটা আমা’র বিশ্বা’স, তা হলে কি আপনার বাড়িটা ভেঙে জমিটা আমাকে দিয়ে দেওয়া হবে?ইতিহাসের পুনর্নির্মাণ করা তো আ’দালতের কাজ নয়। আ’দালত সিদ্ধান্তে পৌঁছয় অকাট্য প্রমাণ এবং প্রামাণ্য নথিপত্রের ভিত্তিতে।

বাবরি ম’সজিদ যেখানে ছিল, সেই জমিতে মন্দির তৈরির নির্দেশ সুপ্রিম কোর্ট কোন অকাট্য প্রমাণ ও প্রামাণ্য নথির ভিত্তিতে দিল, সেটা বুঝতে আমা’র অ’সুবিধা হয়েছে।বাবরি ম’সজিদ যে ওখানে ছিল, পাঁচ শতাব্দী ধরে ছিল, সে আম’রা সবাই জানি। বাবরি ম’সজিদ যে গুন্ডামি করে ভেঙে দেওয়া হল, সেটাও আম’রা দেখেছি।এমনকি সুপ্রিম কোর্ট এ দিনের রায়েও মেনে নিয়েছে যে, অন্যায় ভাবে ম’সজিদটা ভেঙে দেওয়া হয়েছিল কিন্তু ১৫২৮ সালের আগে ওখানে রাম মন্দির ছিল কি না, আম’রা কেউ কি নিশ্চিত ভাবে জানি? রাম মন্দির ভেঙেই বাবরি ম’সজিদ তৈরি করা হয়েছিল, এমন কোনও অকাট্য প্রমাণ কি কেউ দাখিল করতে পেরেছিলেন? পারেননি।তা সত্ত্বেও যে নির্দেশটা শীর্ষ আ’দালত থেকে এল, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক নয় কি?’

Sharing is caring!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *